জহিরুল ইসলাম উপকূলীয় প্রতিনিধি।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের সন্তান আব্দুল হালিম। নদী, খাল, বন ও সাগরঘেরা এই জনপদেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই তিনি প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে বড় হয়েছেন। কিন্তু এই প্রকৃতি যেমন সৌন্দর্যের আধার, তেমনি দুর্যোগেরও নির্মম সাক্ষী। তাই ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব।
উপকূলের মানুষের মতো তিনিও জীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির নির্মম রূপের মুখোমুখি হয়েছেন। তার চোখের সামনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান, ইয়াসসহ একের পর এক দুর্যোগ। জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে নদীর বেড়িবাঁধ, তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। অনেক পরিবারকে রাতারাতি আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হয়েছে। সেইসব কঠিন সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রয়েছেন আব্দুল হালিম।

তবে তিনি শুধু একজন দর্শক হয়ে থাকেননি। দুর্যোগ মোকাবিলায় সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। বাঁধ রক্ষা আন্দোলন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
বিশেষ করে নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনাগুলো তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কারণ তিনি জানেন, একটি বাঁধ ভেঙে গেলে হাজারো মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

তাই স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাঁধ সংস্কার ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে তিনি কাজ করেছেন এবং সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করার কারণে তিনি উপলব্ধি করেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, বরং উপকূলের মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। তাই বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, নদী দূষণ রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন।
আব্দুল হালিম বিশ্বাস করেন, উপকূলকে রক্ষা করতে হলে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে।
মানুষের সচেতনতা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমেই দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই তিনি একজন পরিবেশযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে চলেছেন।

আজও যখন কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকেন তিনি। উপকূলের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাকে অনুপ্রাণিত করে। তার জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের গল্প নয়; এটি উপকূলের সংগ্রামী মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, প্রকৃতিকে ভালোবাসার গল্প এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ের গল্প।
Leave a Reply